বৃত্তবন্ধি


      বছর চারেক আগে মিরা নামক এক তরুণীর সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল। তরুণী আমাকে দেখলে দূর থেকে ছুটতে ছুটতে আসত। এসে জিজ্ঞেস করত “স্যার, ভাল আছেন”? আমি বিরক্ত হতাম। কিন্তু আমার সেই বিরক্তি কখন মিরা বুঝতে পারত না। হেসে হেসে আমার সাথে কথা বলত। এ নিয়ে ভেতরে ভেতরে টিচার্স রুমে কথা বার্তা চলত। আমি সবই বুঝতে পারতাম এবং প্রচণ্ড বিরক্ত হতাম। একদিন প্রিন্সিপল স্যার ডেকে নিয়ে গিয়ে বললেন “মাসুদ সাহেব, আপনার কোন অসুবিধা হলে আমাকে বলবেন”। আমি বললাম “আমার কি অসুবিধা হবে স্যার”? তিনি বললেন, “মহিলা কলেক, পাড়ায় একবার কোন গুজব রটে গেলে তা কিন্তু সারা জিবনের জন্যই গায়ে লেগে থাকবে”। আমি অবাক হলাম, বললাম, “আমার কোন অসুবিধা হলে আমি আপনাকে অবশই বলব”।  

আমি মিরা নামক সেই তরুণীকে তার পর থেকে এড়িয়ে চলতে শুরু করলাম। ক্লাসে ঢুকলে ভুলেও কোনার বেঞ্চের দিকে তাকাতাম না। মিরা যে রাস্তা ধরে বাড়ি ফিরে আমি সেই রাস্তা সর্বক্ষণের জন্য ভুলে গেলাম। থাকনা সে তার মত। পরের বৈশাখ মাসে আমার পোস্টিং হল সীতাকুণ্ডে। অনেক বড় কলেজ, পাশেই গারো পাহাড়। তৃপ্তির ঢেকুর তুলে আমি বাড়ি চলে গেলাম। সন্ধ্যায় শুরু হল প্রচণ্ড ঝর বৃষ্টি। বৃষ্টি আমার ভাল্লাগে। কিন্তু এবারের বৃষ্টিতে মনে হল প্রকৃতি যে নিজ দায়িত্বে আমার যাত্রায় বাধা দিচ্ছে। বাধা আমার ভাল্লাগেনা। 


 আমি খুব কম অবাক হই। কিছু কিছু মানুষের অবাক হওয়ার ক্ষমতা থাকে না, আমি তাদের দলে।কিন্তু দরজায় নক শুনে আমি অবাক না হয়ে পারলাম না। সাধারনত আমার কাছে কেউ একটা আসে না, আর এই ঝর বৃষ্টির রাতে তো আসার কথাই না। আমি দরজা খুললাম। মোমের আলোয় স্পষ্ট দেখলাম মিরার ফর্সা গাল ঠাণ্ডায় লাল  হয়ে গেছে। বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে সে বলল, “স্যার ভাল আছেন?” আমি আবার অবাক হলাম। শুধুমাত্র আমি কেমন আছি এটা জানার জন্য কোন তরুণী নিশ্চয়ই এই ঝর বৃষ্টির রাতে আমার কাছে আসতে পারেনা। আমি তাকে ঘরে ঢুকতে বললাম না। সে দরকার বাইরে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বলল, “স্যার আপনি তো কাল সীতাকুণ্ডে যেতে পারবেন না। আপনার নিয়তি এখানেই লিখা আছে। এ গণ্ডি ছেড়ে আপনি বাইরে বেরুতে পারবেন না”। আমি বললাম “তুমি কি করে জান”? মিরা মুখে এক ধরনের বিচিত্র হাসি ফুটিয়ে তুলল। “আমি অনেক কিছু আগে থেকে বলতে পারি” বলেই সে হাঁটা শুরু করল। হঠাৎ দমকা বাতাসে আমার হাতের মোমবাতি নিভে গেল। অনেক্ষন ধরেই সে বাতাসের সাথে যুদ্ধ করে আসছিল, এবার হেরে যেছে। আর মিরা মিশে গেল অন্ধকারে।


 পরেরদিন সকাল দশটা ছাব্বিশে আমি সীতাকুণ্ডের ট্রেনে রওনা দিলাম। আমাদের কলেজের পিয়নের হাতে একটা চিঠি ধরিয়ে দিয়ে বল্লাম মিরাকে দিও। চিঠিতে লিখা “মিরা, তোমার ধারনা ভুল প্রমান হয়েছে, আমি এই মাত্র ট্রেনে উঠলাম। তুমি যখন এই চিঠিটা পড়বে তখন আমি দুটা গ্রাম পার হয়ে যাব।ভাল থেকো মিরা”। ট্রেনে আমার গাঁ কাঁপিয়ে জ্বর আসলো। আমার পাশে বসা ভদ্রলোক আমার অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে গেলেন। আমার মাথার তখন বারবার একটা লাইন ঘুরপাক খাচ্ছিল, “স্যার ভাল আছেন”? আমি আমার পাশে বসা ভদ্রলোককে  বললাম, “ভাইসাহেব আমার একটা উপকার করুন। আমাকে একটা বেক টিকেট কেটে দিন, আমি ফিরে যাব”। আঠার দিন একটানা জ্বরে ভুগে আমি আবার আগের কলেজে পড়ান শুরু করলাম। আমি ক্লাসে খুঁটিতে খুঁটিয়ে মিরার ব্যাবহার লক্ষ করতে লাগ্লাম। সে এখন আর আমাকে এসে “স্যার কেমন আছেন?” বলে না। সবকিছুতে কেমন একটা গাঁ ছাড়া ভাব। আমি মিরা নামক তরুণীর চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে  ফেললাম।


 আমি কখন কোন তরুণীর কাছ থেকে প্রেম নিবেদন পাইনি। আমার ধারনা ছিল কোন তরুণীর পছন্দের জন্য আমি যোগ্য না। হঠাৎ, এক দুপুরে টিচার্সরুমে মিরা এসে বলল, “মাসুদ, আমি তোমাকে ভালবাসি, আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই”। আমি হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমি বললাম, “মিরা তুমি এসব কি বলছ। মিরা বাড়ি যাও”। মিরা কাঁদতে শুরু করল। কাঁদতে কাঁদতে একই লাইন বারবার বলতে লাগলো, “মাসুদ, আমি তোমাকে ভালোবাসি, আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই”। আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, “মিরা তুমি অসুস্থ। তোমার চিকিৎসা দরকার।” মিরা স্থির চোখে আমার দিকে তাকাল। তার চোখে কিছু একটা ছিল যে আমার সারা শরীর শিউরে উঠল। একসময় মিরা দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আমার মনে হল ঠাণ্ডা একটা বাতাস আমাকে ঘিরে ঘুরপাক খেয়ে বেরিয়ে গেল। 

সেদিনের পর থেকে মিরাকে আর কলেজে আসতে দেখা যায়নি। প্রিন্সিপল স্যার তার বাড়িতে খোঁজ খবর করেছিলেন, সেখানেও তেমন কোন খবর পাওয়া যায়নি। এই চার বছর পর মিরাকে আমি প্রায় পুরোপুরি ভুলে গেছি। আমি বইয়ের থেকে চোখ সরিয়ে বললাম, “রোল নাম্বার নাইনটিন, এতক্ষণ আমি যা পড়িয়েছি তার সারমর্ম বল”। কোনার বেঞ্চ থেকে একটা মেয়ে উঠে দাঁড়াল। সে কোন উত্তর দিতে পারছে না। আমি পড়ানোর সময় সে পাশের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। আমি বিরক্ত হয়ে চেয়ার ছেড়ে তার কাছে গিয়ে বললাম, “কি হল বলছ না কেন”? মেয়েটা আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল, “স্যার ভাল আছেন”? আমার মনে হল ঠাণ্ডা একটা বাতাস আমাকে ঘিরে ঘুরপাক খেয়ে বেড়িয়ে গেল। 

 

প্রকৃতি রহস্যময়। প্রকৃতি আমাদের ঘিরে বৃত্ত তৈরি করে। সেই বৃত্তের মাঝে একই জিনিস বিভিন্নভাবে বারবার ফিরে আসে। মানুষ সেই বৃত্ত ভেঙ্গে বের হতে পারেনা। এই বৃত্ত ভাঙ্গার নিয়ম নেই।  

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

কেন মেঘ আসে - পর্ব ৪