টুকুন

সদ্য জন্ম নেওয়া নবজাতক ছেলেটাকে দেখে আমি একটা কথাই বলেছিলাম, "এইটুকুন বাচ্চা, এত সুন্দর হয় কেমনে?" সেই থেকে তার নাম হয়ে গেল টুকুন। "এইটুকুন" থেকে "টুকুন"। ল্যাটিন শব্দ থেকে যেমন অনেক ইংরেজি নাম রাখা হয়, ব্যাপারটা অনেকটা সেরকম। পরে আর কোন ভাল নাম রাখা হয়নি। তার মা অবশ্য আবির হাসান বলে ডাকে কিন্তু সেটা স্থায়ী না। ছেলেটা আমার কিছুই পায়নি। তার বাবার মত তীক্ষ্ণ চোখ, লম্বা নাক আর কানের পাশে কালো দাগটা পেয়েছে। তার বাবাকে আমি দেখিনি, কিন্তু তার মাকে প্রায়ই এসব বলতে শুনেছি। আমার নিঃসঙ্গ জিবনের তখন আরেকজন সঙ্গী হল টুকুন।
...দেখ টুকুন, বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের খেলা হচ্ছে। তোর কি মনে হয় কে জিতবে?
...আ-আ-আআ-আ
...কি বলছিছ? পরিষ্কার করে বল। বুঝিনা তো।
...আ-আ-আই
...কিহ, পাকিস্তান জিতবে? গাধার বাচ্চা, তুই তো এটাই বলবি। তুই তো আর আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে কিছু জানিস না। তখনও আমরা পাকিস্তানকে হারিয়েছি, আজকেও হারাব।
...আ-আইইই
...অসভ্যের মত হাসবি না। আচ্ছা ঠিক আছে, আজকে যদি পাকিস্তান জিতে তাহলে আমি টিভি সেটটা ভেঙ্গে ফেলব,আর যদি বাংলাদেশ জিতে তাহলে তোকে খাট থেকে নিচে আছাড় মারবো।

টুকুনের আকাশ ভাঙ্গা কান্না শুনে তার মা রান্নাঘর থেকে দৌড়ে আসলো। টুকুনকে ফ্লোরে কাঁদতে দেখে আমার দিকে ভয়ে বড় বড় চোখে তাকাল। বোধয় ভাত রান্না করছিল, হাতে ভাত নাড়ার চামচটা রয়ে গেছে। সাথে কয়েকটা ভাত লেগে আছে আর তার উপর মাছি ভন ভন করছে। ইন্টারেস্টিং দৃশ্য, মাছিগুলা ভাত খাচ্ছে না কিন্তু তার উপর মাঝে মাঝে ঠোকর মারছে আর জিবানু ঢুকিয়ে দিচ্ছে। এতে মাছিগুলোর কি লাভ হল? আমি সকালে ঘুম থেকে উঠার আগে টুকুন আর তার মা বাড়ি ত্যাগ করল।

...বাবা?
...হু
...দেখেছ কি সুন্দর চাঁদ উঠেছে বাহিরে?
...এখান থেকে দেখতে যতো সুন্দর লাগছে চাঁদের পৃষ্ঠে পা রাখলে তোর ঠিক ততোটাই অসুন্দর লাগত। চাঁদ আসলে সুন্দর না,আমরা তাকে সুন্দর হিসেবে দেখি।
... সেটা তখনকার বিষয় যখন আমি চাঁদের পৃষ্ঠে পা রাখব। এখন সুন্দর লাগছে সেটাই বড় কথা কারণ এটা এখন।
...সেটা তুই যা ভাবিস।
...বাবা, একটা গল্প বল না
...গল্প শুনবি?
...হু
...এতবড় পৃথিবীর মাঝে বাংলাদেশ নামক ছোট্ট একটা দেশে দুইটা অদ্ভুদ ছেলে মেয়ে বাস করত। অদ্ভুদ কারন তারা দুইজন দুইজনকে স্বর্গীয় ভালোবাসতো। কিন্তু হঠাৎ একদিন সব পাল্টে গেল। এবরশেন না করায় মেয়েটার প্রেমিক তাকে ছেড়ে চলে গেল। মেয়েটা অনেক কাঁদল। অনেকবার আত্মহত্যা করতে গিয়েও পারল না, ভিতু ছিল তো। তারপর বাসা থেকে ঠিক করে একজন ডিভোর্স লোকের সাথে তার বিয়ে দিয়ে দিল। কিন্তু মজার বিষয় হল মেয়েটা কোনদিন তার স্বামীকে ভালবাসতে পারেনি। কিছুদিন পর তার একটা ফুটফুটে ছেলে সন্তান হল। আর সে আজকের আমার টুকুন।
...যাহ বাবা, তুমি সব গল্পের কোন না কোন চরিত্রকে আমার নাম দাও। আমার নাম কি এতই সুন্দর যে সব গল্পে আমার নাম দেওয়া লাগবে।
...আহা, রাগ করছিছ কেন? গল্পতো এখনো শেষ হয়নি, আগে শোন।
...নাহ আমি শুনব না। আজ তোমার পাশে ঘুমাবও না।

টুকুন চলে যাওয়ার পর আমি পাশ ফিরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বললাম, "নাহ ছেলেটা আসলেই খুব জেদি হয়েছে, ঠিক তার বাবার মত।"

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বৃত্তবন্ধি

কেন মেঘ আসে - পর্ব ৪