কেন মেঘ আসে- প্রথম পর্ব

বাদলের মাথা ঝিম ঝিম করছে। সে অনেকদিন থেকে লক্ষ্য করছে সামান্য টেনশনে তার মাথা ঝিম ঝিম করে। মাথায় কোন সমস্যা হল নাতো, এই যেমন মাথার কোন নিউরন অক্সিজেনের অভাবে দুর্বল হয়ে পরেছে যার জন্য মাথা ঝিম ঝিম করে। এবার অবশ্যই জেলাতে গিয়ে কোন ভাল ডাক্তার দেখাতে হবে। বাদলের টেনশনের প্রধান কারন শহর থেকে তার স্যারের অসম্ভব রূপবতী স্ত্রী এসেছেন। সে এখন তার সামনে চেয়ারে বসে আছে। একুশ-বাইশ বছর বয়স, গোলগাল সুন্দর চেহারা, চিবুকের নিচে তিল আছে। চিবুকের নিচে ডান পাশে যাদের তিল থাকে তাদের নাকি অর্থসংকট সবসময় লেগে থাকে। এ তথ্য তাকে দিয়েছিল নিতু। স্যারের স্ত্রীর চিবুকের ডান পাশে তিল আছে তবে এ মেয়েকে দেখে মনে হয়না সে অর্থসংকটে আছে। নিতুর কথা ভুল হয়না। এবার কেন ভুল হল। নিতুর কথা মনে পরাতে তার সামান্য খারাপ লাগছে। বাদল তার সামনে বসে থাকা মেয়েটার নাম মনে করতে পারছে না। তারা বসে আছে স্টেশন মাস্টারের ঘরে। ট্রেন থেকে নেমে স্যারের স্ত্রীকে দেখে বাদল পাথরের মত জমে গেল। এমন হওয়ার কোন কারন ছিল না। তবুও তাকে দেখলে বাদলের এমন হয়। মেয়েটা তাকে দেখে বলল, “বাদল সাহেব ভাল আছেন।”
সে বলল, “জি ভাল আছি। জি ভাল আছি।” 
অতিরিক্ত টেনশনে সে এক কথা দুইবার করে বলে। এখন দুইবার করে বলতে শুরু করেছে। মেয়েটা ভ্রূ কুচকে বলল, “আপনি এক কথা দুইবার বলছেন কেন? আপনার জানা না থাকলে বলে রাখি আমার কানে কোন প্রকার সমস্যা নেই। আমি কোন কথা একবার বললে বুঝতে পারি।” তার কথা শুনে বাদলের নিজেকে সর্বশ্রেষ্ঠ গাধা মনে হচ্ছিল।
মেয়েটা তাকে বলল, “বাদল সাহেব, আমার সঙ্গে কোন পুরুষ মানুষ নেই।আপনি কি আমাকে উপজেলায় যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিবেন?”
বাদল বলল, “অবশ্যই। অবশ্যই।”
উপজেলায় যাওয়ার ব্যবস্থা সে করেছে। এত রাতে এখানে কোন গাড়ি পাওয়া যায় না। তাই ঠিক করেছে নৌকায় করে ঘুরো পথে যাওয়া হবে। এতে সময় বেশি লাগবে। তবে কি আর করা। এত রাতে কোন তরুণীকে একা যেতে দেওয়া ঠিক না। তাই সে নিজেও নৌকার করে যাবে। কথাগুলা বলতে স্টেশন মাস্টারের ঘরে সে ঢুকেছে। কিন্তু মেয়েটাকে কথাগুলা বলতে পারছে না কারন সে হ্যারিকেনের আলোয় বই পরছে। খাবার সময় কাউকে সালাম দেওয়া যায় না। বই পড়ার সময় কাউকে ডিস্টার্ব করা যায়না, এমন কোন কি নিয়ম আছে? বাদল কথা না বলে বই পড়া শেষ হওয়ার জন্য বসে রইল। 
-আপনি কি আমাকে চা খাওয়াতে পারেন?আমার খুব মাথা ধরেছে। 
- এখনকার চা ভাল হয়না। তবে স্টেশনের বাইরে টং দোকান আছে সেখানে চা ভাল বানায় তবে শুধু রঙ চা। আপনি খাবেন?
-আমি রঙ চা খাই না।
বাদলের এখন ভাল লাগছে। মেয়েটার নাম মনে পরেছে, তার নাম রাত্রি। শেষবার রাত্রি যখন এখানে এসেছিল তখন তাকে নাম মনে রাখার একটা কৌশল শিখিয়ে গেছে। রাত্রি যখন শুনল সে কারো নাম মনে রাখতে পারে না তখন সে বলল, “ আপনাকে নাম মনে রাখার একটা কৌশল শিখাতে পারি। ধরুন কারো নাম রানা, আপনি তখন তার নামের সাথে শব্দ মিলিয়ে ছন্দ বানাবেন যেমন রানা, কানা,মানা। এতে করে কাউকে দেখলে তার নাম মনে না আসলেও তার নামের সাথে মিলানো শব্দগুলা মনে আসবে। কিন্তু সমস্যা হল এ ট্রিক্স সবার ক্ষেত্রে কাজ করে না। যেমন ফয়সাল, আপনি কিছুতেই তার নাম মনে রাখতে পারবেন না”। বাদল ফয়সালের নাম মনে রেখেছিল। কিন্তু সে রাত্রির নাম ভুলে গেছে।
যাত্রার ব্যবস্থা সুন্দর। রাত্রি বলল, “আপনি তো ভাল কাজ দেখিয়েছেন বাদল সাহেব। আমি জানতাম আপনি বোকাসোকা মানুষ কিছু আপনি যে কাজেও পটু এটা জানতাম না। আপনি আমাকে সত্যি ইমপ্রেস করেছেন”। রাত্রির ইমপ্রেস হওয়ার যথেষ্ট কারন আছে।বাদল যাওয়ার জন্য ছইওয়ালা নৌকা যোগাড় করেছে। নৌকার ভেতর সুন্দর করে বিছানা করা। পাশে পর্দা লাগানো যাতে রাত্রি ঘুমাতে চাইলে ঘুমাতে পারে। বিছানার পাশে ফ্লাক্সে করে চা আছে, রঙ চা না দুধ চা, বাদল মাঝির বাড়ি থেকে বানিয়ে আনিয়েছে।  ছইয়ের ভেতর বাদল তার প্রিয় একটা গল্পের বইও দিয়ে দিয়েছে, নাম মেঘ বলেছে যাব যাব। হুমায়েন আহমেদের লেখা। বইটা তাকে দিয়েছিল নিতু। মেয়েটার বই পড়ার ঝোঁক ছিল। রাত্রিও বোধহয় বই পড়ার ঝোঁক আছে। নিতুর সাথে এই মেয়ের অনেক মিল। বাইরে অপূর্ব জ্যোৎস্না। রাত্রি নৌকায় উঠে বলল, ছইয়ের ভেতর হারিকেন থাকতে পারবে না। আমি জ্যোৎস্না দেখতে দেখতে যাব। আপনি হারিকেন নিভিয়ে দিন”। বাদল তার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। সে হারিকেন নিভিয়ে দিয়ে মাঝির সাথে গিয়ে  বসেছে। অন্ধকার আর প্রবল জ্যোৎস্না একত্র হয়ে এক অন্য আলো তৈরি করেছে। যে আলো পুরোপুরি আন্ধকারও না উজ্জ্বলও না। নৌকা সেই আলোয় চলতে শুরু করল। বাদলের সামান্য মন খারাপ হল। তার ইচ্ছা ছিল নিতুকে বিয়ের পর তাকে নিয়ে ঠিক এরকম একটা রাতে নৌকার করে ঘুরবে। নিতু অল্পতে মুগ্ধ হয়। সে অবাক হয়ে চারদিকে তাকিয়ে বলবে, “এত সুন্দর রাত তুমি আমাকে দিয়েছ, তার জন্য আমি তোমার জন্য জনম জনম কাঁদবো”। বাদল দুঃখ পাওয়া স্বরে বলবে,   
                                              আমার মাঝে তোমার লীলা হবে                                     
                                              তাইতো আমি এসেছি এই ভাবে 
                                              এই ঘরে সব খুলে যাবে দ্বার
                                               ঘুচে যাবে সকল অন্ধকার
                                               আনন্দময় তোমার এ সংসার
                                               আমার কিছু আর বাকি না রবে
                                                মরে গিয়ে বাঁচবো আমি, তবে
                                                 আমার মাঝে তোমার লীলা হবে” 
নিতু হাসতে হাসতে বলবে, “রবীন্দ্রনাথ তোমার আবৃতি শোনার আগেই ফিট হয়ে যেত, ভাগ্যিস উনি এখানে নেই।” বাদল বলবে, “রবীন্দ্রনাথ এখানে থাকলে চমৎকার একটা রাত আমাদের সাথে উপভোগ করতে পারতো। তবে আবৃতি শুনে বারবার ফিট হয়ে গেলে একটা সমস্যাই হত, এখানে কাছে ধারে কোন হাসপাতাল নেই।” নিতু তার কথায় খিলখিল করে হাসবে। সেই হাসি অনেকদিন পর্যন্ত বাদলের কানে বাজবে। নিতু এখন কেমন আছে? সে কি এখনো আগের মত অল্পতেই মুগ্ধ হয়? বাদলের খুব জানতে ইচ্ছা করে।   
ছইয়ের ভেতর থেকে রাত্রি মাথা বের করে বলল, “বাদল সাহেব, মাঝিকে একটা গান ধরতে বলুন তো।”
মাঝির বয়স বেশি না। উনিশ- কুড়ি হবে। তার ভরাট গলা। বাদল ইশারা করতে সে গান ধরল,
                                      চাঁদনী পসরে কে আমারে স্মরণ করে
                                      কে আইসা দারাইসে গো আমার দুয়ারে
                                       তাহারে চিনিনা আমি সে আমারে চিনে 
ছইয়ের ভেতর থেকে কান্নার শব্দ আসছে। রাত্রি কাঁদছে, তার কি এতো কষ্ট? বাদল মনে মনে বলল আহারে! আহারে! 

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বৃত্তবন্ধি

কেন মেঘ আসে - পর্ব ৪