কেন মেঘ আসে - পর্ব ২
ফয়সালের মেজাজ খিটখিটে হয়ে আছে। তার বয়স চল্লিশ। দিন দিন মনে হচ্ছে তার মেজাজ আরো খারাপ হচ্ছে। কিন্তু বাসায় ডুকে তার মন ভাল হয়ে গেল। তার খাটে রাত্রি ঘুমাচ্ছে। রাত্রিকে দেখে সে যতটা না খুশি হয়েছে তার চেয়ে বেশি অবাক হয়েছে। রাত্রির শাড়ি এলোমেলো, শাড়ির নিচে সে কিছুই পরেনি। রাত্রি কখন এভাবে শুয়ে থাকবে সে ভাবতে পারেনি। ফয়সালের মনে হল মেয়েটা দিন দিন অদ্ভুত হয়ে যাচ্ছে। সে রাত্রিকে ধাক্কা দিয়ে ডাকল।
-রাত্রি
-হু
-কখন এসেছ?
-হু
-তুমি আসবে আমাকে বললেই পারতে, আমি স্টেশনে গাড়ি নিয়ে চলে যেতাম। নৌকায় এসেছ?
-হু
-এতো রাতে একা একা এসেছ কিভাবে?
-হু
রাত্রি ঘুমের ঘোরে হু হু করছে। সে জেগে থাকতে কিছুক্ষণ গল্প করা যেত। ফয়সালের মনে হল রাত্রির মুখটা আগের থেকে ছোট হয়ে গেছে। সে কি খাওয়াদাওয়া ঠিক মত করছে না? নাকি বড় কোন অসুখ থেকে মাত্র সেরে উঠেছে। কথাটা মনে করে রাত্রিকে অবশ্যই জিজ্ঞেস করতে হবে। সে হাতমুখ ধুয়ে নিচতালায় রাতের খাওয়া খেতে গেল। এখন রাত দুইটা বাজে। কিন্তু বাসায় সব কাজের লোক জেগে আছে। তারা জানে বড় সাহেব এখনো খায়নি। ফয়সাল খেতে খেতে রহমত মিয়ার সাথে গল্প করে। সে খাওয়ার সময় রহমত মিয়া সবসময় পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে। ফয়সাল বলল, রহমত
-জে
-তোমার আপামনি কি সুন্দর?
-জে, একেবারে পরীর লাহান সুন্দর।
-রহমত, তুমি কি পরি কখন দেখছে? না দেখে কিভাবে বুঝলা পরীরা সন্দর হয়?
-আমি দেখি নাই। আমার এক মামা আছিল উনার এক ইসতিরি আছিল পরী। আমারে উনি বলছেন পরীরা বড়ই সুন্দর হয়।
-তোমার ওই মামাকে একদিন আমার কাছে নিয়ে আসবা।
-জে আইচ্ছা
ফয়সাল আর কথা বাড়াল না। পরী বিষয়ে তার আর কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। সে হাত ধুয়ে উঠে পড়ল। নিজের ঘরে গিয়ে দেখল রাত্রি ঘুম থেকে উঠেছে। এখনো বিছানায় আছে তবে শাড়ির নিচে ব্লাউজ পরেছে, যত্ন করে চুল আঁচড়িয়েছে। ফয়সালকে ঢুকতে দেখে উঠে বসলো। ফয়সাল বলল, তুমি একা একা চলে আসবে ভাবতে পারিনি।
-একা একা আসিনি তো, স্টেশন থেকে তোমার পিএস বাদল সাহেব নিয়ে এসেছেন।
-ওহ তাহলে তো কোন আসুবিধা হয়নি। বাদল সাহেব নিজের জান থাকতে তোমার কিছু হতে দিবেনা।
রাত্রি হাসল।
-বাদল সাহেবকে আমি আমাদের সাথে ডিনার খাওয়ার জন্য দাওয়াত দিয়েছি। তুমি আমি থাকতে থাকতে তাকে অফিস থেকে সাথে করে নিয়ে এসো।
ফয়সাল জবাব দিল না। সে এখন প্রচণ্ড ব্যস্ততা দেখি কিছু খুঁজছে। রাত্রি বুঝতে পারছে না একটা মানুষ শুধু শুধু কেন অভিনয় করছে।
-তুমি এত রাত পর্যন্ত কোথায় ছিলে?
-বিরাট ঝামেলা, একটু গ্রামের দিকে যেতে হয়েছিল। গতকাল গাড়ি বের করার সময় এক ছোট বাচ্চা আমার ড্রাইভারের চাকার নিচে পরে মারা গিয়েছে। বাপ-মা আমার নামে কেইস খাইয়ে দিয়েছে। পত্রিকায় পত্রিকায় ছাপা হল, “উপজেলা নির্বাহী অফিসারের গাড়ির নিচে পরে চার বছরের এক বাচ্চার মৃত্যু”।
-তারপর তুমি কি করলে? তাদের বাড়িতে গিয়ে টাকা সাধলে কেইস তুলে নেওয়ার জন্য?
-হ্যাঁ তা ছাড়া আর উপায় কি বল।আর অ্যাকসিডেন্ট তো আমি ঘটাই নি। মূর্খ জনগন আমার নামে কেইস তুলে দিল।
-তার জন্য তো মূর্খ জনগণকে শিক্ষিত করার দায়িত্ব তোমার।
-তাদেরকে শিক্ষিত করার জন্যই তুমি জমি কিনে স্কুলের জন্য দান করলে, তাইনা?
রাত্রি হাসল। তার আসলেই ঘুম পাচ্ছে আবার ফয়সালের সাথে কথা বলতেও ভাল লাগছে। সে কোণটা করবে বুঝতে পারছে না। রাত্রি বলল, ফয়সাল, আমি একা ঘুমাতে চাচ্ছি। কেন চাচ্ছি সেটা জিজ্ঞেস করো না। তোমার হয়ত খারাপ লাগবে।
-আমার এতো সহজে মন খারাপ হয় না।
-তোমার সাথে ঘুমালে মনে হয় আমি অন্য কোন পুরুষের সাথে শুয়ে আছি। তুমি বলেছিলে তোমার সহজে মন খারাপ হয় না, কিন্তু তোমার মন খারাপ হয়ে গেছে। তুমি চাইলে এই মুহূর্তে আমাকে চুমু খেয়ে মন ভাল করতে পার।
ফয়সাল বাতি নিভিয়ে পাশের ঘরে ঘুমাতে গেল। নিজের বিছানা ছাড়া অন্য কোথাও তার ঘুম হয়না। হয়ত আজ সারা রাত তাকে জেগে কাটাতে হবে।
বাদলের প্রচণ্ড জ্বর। সেইদিন নৌকায় আসার সময় বৃষ্টি হয়েছিল। সে মাঝির সাথে বসে থেকে বৃষ্টিতে ভিজেছে। ছোটবেলা থেকে বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে লাগলে তার জ্বর উঠে যায়। সে থার্মোমিটারে দেখল জ্বর একশো চার ডিগ্রী। তার মানে জ্বর আগের থেকে কিছুটা কমেছে। বাদল জ্বরের ঘোরে স্বপ্নও দেখে ফেলেছে। সে স্বপ্ন দেখল রাত্রিকে। না রাত্রিকে না নিতুকে। তবে স্বপ্নে রাত্রিকে নিতু বলে মনে হচ্ছিল। সে দেখল নিতু সহজ ভঙ্গিতে তার পাশে খাটে এসে শুয়ে বলল, তোমার বুঝি খুব জ্বর? সে বলল, নিতু আমার মনে হচ্ছে আমার সামনে অনেক অন্ধকার, আমি সেই অন্ধকারে পরে যাচ্ছি। নিতু তার কপালে হাত রাখল। সাথে সাথে তার ঘুম ভেঙ্গে গেল। ঘুম ভেঙ্গে দেখল কিছু নেই। রাত্রি বা নিতু কেউ আসেনি, কেউ তার কপালে হাত রাখেনি। বাদল কখন আফিস কামাই করে না। সে একশ চার ডিগ্রী জ্বর নিয়ে অফিসে গেল। বিকেল হতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফয়সাল সাহেব তাকে বললেন,
-বাদল সাহেব, আপনার বুদ্ধিমত্তা আমার চেয়ে অনেক নিচে কিন্তু তবুও রাত্রি আমার চেয়ে আপনাকে বেশি পছন্দ করে কেন বলুন তো?
বাদল কি বলবে বুঝতে পারছে না। তার চোখে বিভ্রাটের দৃষ্টি। স্যার কি তার উপর রাগ করেছেন? সে সেদিন রাত্রিকে বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে তার জন্য? ফয়সাল ক্ষমতাশীল মানুষ, এদের রাগের উপর অনেক কিছু নির্ভর করে। ফয়সাল বলল,
-বাদল সাহেব আপনি কিন্তু অবশ্যই আজকে আমার সাথে আমার বাড়িতে যাবেন। রাত্রি আজ নিজ হাতে আপনার জন্য রান্না করেছে। আপনি না গেলে বেচারি মনে কষ্ট পাবে।
রাত্রির মাথা ব্যাথা। এখানে আসার পর থেকে তার মাথা ব্যাথা বেশি হচ্ছে। ফয়সাল খেতে বসে বলল,
-ভাইসাহেব, ওর মাথা ব্যাথা। আপনি কিছু মনে করবেন না, ও আমাদের সাথে খেতে বসবে না। কিন্তু বিশ্বাস করুন, ও মন থেকে সবকিছু রান্না করেছে।
বাদল কিছু বলল না। তার খারাপ লাগছে। মনে হয় জ্বর বেড়েছে। ইচ্ছা না করলেও তাকে খেতে বসতে হয়েছে। কিন্তু স্যারের সামনে “খাব না” বলতে পারছে না। সে ভাতের নালা মুখে দিয়ে বমি করে ভাসিয়ে দিল। রহমত বলে উঠল, ওরে আল্লাহ! ওরে আল্লাহ!
এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।
উত্তরমুছুন