কেন মেঘ আসে - পর্ব ৩

বাদলের জ্বর অনেক বেড়েছে। তাকে নিচের তালার একটা ঘর দেওয়া হয়েছে। তার চোখ লাল হয়ে উঠেছে। ফয়সাল রহমতের দিকে তাকিয়ে বলল, “এখন কি করি রে রহমত?

পাশ থেকে রহিমার মা বলে উঠল, “ডাক্তাররে খবর দেন। এ আর বেশিক্ষণ বাঁচবে বলে মনে হয়না”। 

ফয়সাল ব্যাকুল হয়ে সরকারি হাসপাতালে ফোন দিন। কেউ ফোন ধরছে না। শালার দুনিয়া! হয়ত দেখা যাবে তারা ঘুমিয়ে আছে, রোগী দেখার সময় নেই। রহমত বলল, এ কোয়াটারে একজন ডাক্তর মহিলা আছে, নাম হাছিনা। ফয়সাল নিজেই ডাক্তার হাছিনা কে ডাকতে ঘর থেকে বের হল। কিন্তু তাকেও ঘরে পাওয়া গেল না। তার মেয়ে ঘুম ঘুম চোখে উঠে এসে বলল, আপনি কে? এত রাতে কেউ কারো বাসায় আসে? আম্মা বাড়িতে নাই, নানার বাড়ি গেছে। ফয়সাল হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরে আসলো। ভোররাতের দিকে রাত্রি প্রথমবারের মত নিচে নেমে আসলো। রাত্রির ঠাণ্ডা হাতের স্পর্শ কপালে পেয়ে বাদল চোখ খুলে তাকাল। বাদল বলল, নিতু আমার খুব জ্বর। রাত্রি বলল, 

-আমি জানি। আপনি চুপ করে শুয়ে থাকুন। সকালের দিকে দেখবেন একবারে ঠিক হয়ে গেছেন। 

-নিতু, তুমি কেন বিয়েটা ভেঙ্গে দিলে? 

-আপনি চুপ করে ঘুমানোর চেষ্টা করছে। এইতো ওষুধ কাজ করতে শুরু করেছে, আপনার ঘাম দিচ্ছে। সকালে জ্বর চলে যাবে। 

বাদল ঘুমিয়ে পরেছে। রাত্রির মানুষটার জন্য খারাপ লাগছে। তার বিয়েটা ভেঙ্গে গেছে সে জানত না।  শেষবার যখন সে এসেছিল তখন বাদল লাজুক মুখে তাকে একটা বিয়ের কার্ড দিয়ে এলো। রাত্রি বলল, আপনার বিয়ে বুঝি? বাদল লজ্জায় লাল হয়ে গেল। বেচারা সেটার জন্য এখনো কষ্ট পাচ্ছে। রাত্রি বলল, 

-আমাকে মেয়ের ছবি দেখান। 

-ছবি আমার সাথে নাই। 

-সত্যি সত্যি নাই? আমার তো মনে হয় বুক পকেটে আছে। 

বাদল ফ্যাকাসে হয়ে গেল তবে বুক পকেট থেকে একটা ছবি বের করে দিল। ছবি দেখে রাত্রি বলল, “আরে মেয়েতো দেখতে প্রায় আমার মত। শুধু ওর লম্বা মোটা ঠোঁট আর আমার চিকন।” 

-আমি কিছু জানিনা। আব্বা ঠিক করছে। 

-আব্বা ঠিক করছে নাকি আপনি আপনি খুঁজে খুঁজে আমার মত মেয়ে বের করেছেন?

বাদল জবাব দিল না। সে কি বা জবাব দিবে। এটা সত্যি যে সে নিতুকে খুঁজে বের করেছে, তার বাবা করেনি। তবে রাত্রির সাথে নিতুর কিছুটা মিল থাকা কাকতালীয়। রাত্রির এই মানুষটার জন্য খারাপ লাগছে। রাত্রি উঠে গিয়ে তার ব্যক্তিগত ডাইরি নিয়ে এলো। সেখানে গুটি গুটি অক্ষর লিখল, 

“সেদিন বাহিরে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। আমি ছিলাম ছইয়ের ভিতর। বাদল সাহেব আর মাঝি বৃষ্টিতে ভিজেছে। আমার ইচ্ছা করছিল বাদল সাহেবকে ভেতরে আসতে বলি, শুধু শুধু ভিতজে কেন। মাঝির ভেজার  দরকার আছে কারন সে নৌকা চালাচ্ছে। তার তো সেখানে বসে থাকার কোন দরকার নেই। কিন্তু লজ্জার ভয়ে আমি তাকে ভেতরে এসে বসতে বলি নি। তিনি যদি আবার কিছু মনে করেন। বাইরে সেদিন  জ্যোৎস্না ছিল। অপূর্ব জ্যোৎস্নার সাথে বাদল সাহেব অপূর্বভাবে আমার নৌকায় থাকার ব্যবস্থা করলেন। তিনি আমার পরার জন্য গল্পের বই দিলেন। বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠায় লেখা , “এই অভাগি তোমার জন্য বেশি কিছু করতে পারবে না, তবে তোমার জন্য জনম জনম কাঁদতে পারবে---ইতি নিতু। বাদল সাহেবের সাথে আমার হঠাৎ দেখা হয়ে যায় ট্রেন স্টেশনে। বইয়ের লেখাটা পরার পর আমি বুঝতে পারলাম তিনি এই বই রাস্তায় রাস্তায় নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। করন বইটা নিতুর লেখা, নিতুর সৃতি। আমার খুব রাগ হল। আমি বইটা আর পড়লাম না। বাদল সাহেব না দেখা মত করে বইটা পানিতে ফেলে দিলাম। নিতুর সৃতি চলে গেল গভির থেকে গভির পানির নিচে। কিন্তু বদল সাহেবের মনে মধ্যেও কি নিতুর সৃতি গভিরে রয়নি? আমি কি তা কখন দূর করতে পারব? আমি কেনই বা করব?”  

 

আনোয়ারা অনেকক্ষণ ধরে তার মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। তার কাছে মনে হচ্ছে পুস্প হুট করে সুন্দর হয়ে গেছে। সে এখন চোখে কাজল দিয়ে কলেজে যায়। এত সাজার দরকার কি? সে কি কারো প্রেমে পরেছে? হয়ত কোন ছেলের সাথে তার ভাব হয়েছে, সেই ছেলে কি তাকে গোপনে অন্য কোন ইংগিত দিয়েছে? আজকালকার ছেলেরা অনেক খারাপ হয়েছে। পুস্পকে তাদের থেকে সাবধান করা দরকার। তিনি তা করছেন না, বসে বসে পুস্পের ভাত খাওয়া দেখছেন। পুস্প বড় বড় ভাতের নালা মুখে দিয়ে খাচ্ছে। মেয়েটা আনন্দ করে খাচ্ছে, তা দেখতে তার ভাল লাগছে। তিনি বললেন, 

-সুলেমানকে একটা খবর দে। আমার তার সাথে কথা আছে।  

পুস্প হু হা কিছু করল না। তার সমস্ত মনোযোগ এখন মাছের কাঁটা বাছার দিকে। আনোয়ারা হতাশ হয়ে আবার বললেন, “মান্নাপাড়ায় নাকি এক বড় পীর ফকির আছে। ভাবতেছি তার কাছে যাব, তোর ভাইয়ের যদি একটা কিছু খোঁজ পাওয়া যায়। আমাকে হাজার খানিক টাকা দিস মা। 

মেয়ের কাছে হাত পাততে এখন আর তার খারাপ লাগেনা। সংসার বলতে এখন পুষ্পই চালায়। তার কাছে চাইবে না তো কার কাছে চাইবে। সেই টাকা পুস্প কিভাবে জোগাড় করে তা তিনি জানেন না। শুধু জানেন মেয়ে দুইটা টিউশনি করে। টিউশনির টাকায় কি দুই কামরার বাড়ি বাড়ি ভাড়া নিয়ে তাদের চলে, নিশ্চয়ই মানুষের কাছে ধার করতে হয়। আনোয়ারা সে বিষয়ে কখন পুস্পকে জিজ্ঞেস করেনি।  

-টাকা কোথায় থাকে তা তো তুমি জান মা। যেখান থেকে নিয়ে নিলেই হয়। 

-তোর কাছে বারবার হাত পাততে হয় ব্যাপারটা আমার খুবই লজ্জা লাগে। 

-লজ্জা পাওয়ার কি আছে? ছোটবেলায় আমাকে গোসল করাতে যখন লজ্জা পাওনি এখন কেন লজ্জা পাচ্ছ? 

আনোয়ারা চুপ করে গেলেন। কোন সাধারন বিষয় নিয়েই পুস্প ক্যাটক্যাট করে বিশ্রী কথা বলে। আনোয়ারার মাঝে মাঝে ভয় লাগে। মেয়ের এই স্বভাবের জন্য তার যদি বিয়ে না হয়? এমনিতেই এখন পর্যন্ত পুস্পের কোন বিয়ের সম্বন্ধ আসেনি। তিনি যে পীর সাহেবের কাছে যেতে চাইছেন ট্যাঁ শুধু তার ছেলে আসিফের খোঁজ পাওয়ার জন্য না। তার ইচ্ছা পীর সাহেবকে বলে পুস্পের জন্যও একটা তাবিজ নিয়ে আসবে। এখন পুস্প তাবিজ পরতে চাইবে কিনা তা হল কথা। 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বৃত্তবন্ধি

কেন মেঘ আসে - পর্ব ৪