কেন মেঘ আসে - পর্ব ৪

সন্ধ্যা হয়ে গেছে। মাথার উপরে বকুল গাছ। মাঝে মাঝে গাছ থেকে ফুল ঝরে পরছে। রাত্রি সেসব ফুলগুলা তুলে পলিথিন ব্যাগের ভেতর ভরছে। তার অনেক ভাল লাগছে। এখানে আসলে সে এক সাপ্তাহের বেশি থাকেনা। কিন্তু এখানে আজ তার বারো দিন। ফিরে যেতে ইচ্ছা করছে না আবার থাক্তেও ইচ্ছা করছে না। তার সবসময় এরকম হয়, দুটা রাস্তা তার সামনে থাকে কিন্তু সে কোণটা বেছে নিবে বুঝতে পারে না। এখান আসার পর তার দুঃস্বপ্ন দেখাটা বেড়েছে। সে অনেকদিন্ন থেকে ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখছে। ব্যাপারটা ফয়সালকে বলা দরকার। ফয়সাল বুদ্ধিমান মানুষ। সে নিশ্চয়ই তার দুঃস্বপ্ন দেখার কারন বের করে ফেলবে। সে দার্শনিক গলায় বলবে, কোন কিছু নিয়ে তোমার মন বিছিন্ন, তুমি তাড়াতাড়ি ঢাকায় গিয়ে বড় কন সাইক্রিয়াটিস্ট দেখাও। সাইক্রিয়াটিস্ট সে দেখিয়েছে। তিনি এখন রাত্রির চিকিৎসাও  করছেন। তার কথা মতোই রাত্রি এখন ঘুমানোর সময় পাশে খাতা কলম নিয়ে ঘুমায় যাতে ঘুম থেকে উঠে সে স্বপ্নগুলা লিখে ফেলতে পারে। রাত্রি দূর থেকে দেখল রহমত হাঁপাতে হাঁপাতে এদিকে আসছে। নিশ্চয়ই তাকে কিছু বলার জন্য আসছে। রাত্রি কি এখন পারে না টুপ করে গাছের আড়ালে চলে যেতে। রহমত এসে যখন দেখবে কেউ নেই তখন সে ভয়ানক ভাবে চমকাবে। মানুষকে চমকিয়ে মজা আছে। বিশেষ করে নির্বোধ শ্রেণির মানুষদেরকে। বিশেষ করে বাদল সাহেবকে। রাত্রি যেদিন তার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, “ দেখুনতো আমার হাত ঠাণ্ডা কিনা?” বাদল তখন অনেক চমকেছিল। ঘর থেকে বের হতেও দরজার সাথে বাড়ি খেয়ে মাথা ফুলিয়ে ফেলল। 

-আপামনি, আপনে এইখানে? সন্ধার পর বন জঙ্গলে থাকা ঠিক না। 

-কেন, সন্ধ্যার সময় বন জঙ্গলে থাকলে কি হয় রহমত? 

-এইসময়ে জিন ভুতে বাহির হয়।তারা মানুষেরে আছর করে। আপনে আমার সাথে বাসায় চলেন। 

-তারা আর কি কি করে? 

রহমত জবাব দিল না। তার কাছে মনে হল মেয়েছেলে হইছে খারাপ জাত। এরা তর্ক করতে পছন্দ করে। এদের জন্য পুরুষ মানুষের বিপদে পরতে হয়। বেহেস্তে হাওয়া (আঃ) যদি গন্ধম ফল আদম (আঃ) খাইতে না বলত তাহলে কোন সমস্যাই হইত না। তারা সুখে শান্তিতে বেহেস্তে জীবন কাটাইতে পারত। সবকিছুর মুলে হইছে মেয়ে জাত। তবুও আল্লাহ মেয়ে জাতকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। 


আবহাওয়ার কারনে হোক বা রহমত আলীর জিনের আসরেই হোক রাতের দিকে রাত্রির গা কাঁপিয়ে জ্বর আসলো। রহিমার মা তার কপালে জলপট্টি দিচ্ছে। মাঝে মাঝে তার সাথে গল্পও করছে। রাত্রির কাছে মনে হচ্ছে রহিমার মা আসলে অনেক ভাল। তাকে সহজে আপন করে নিয়েছে। মানুষটার তার প্রতি এই ভালবাসা সে এতদিন কেন বুঝতে পারলনা? রাত্রি বলল, আমার কি জ্বর বেড়েছে, রহিমার মা? 

-জি, গায়ের তাপে মনে হয় বাড়ছে। 

-তুমি কি জিনের আসরে বিশ্বাস কর?

-আমি বিশ্বাসও করি না আবার অবিশ্বাসও করি না। আপনি কিছু খাবেন? 

-না, তুমি তোমার বড়সাহেব কে ডেকে নিয়ে এসো। 

-তিনি এখন কার সাথে জানি কথা বলছে। 

-তুমি ডেকে আনো। বলবে আমার অবস্থা খারাপ, কিছুক্ষনের মধ্যেই গত হতে পারি। বলতে পারবে না? 

রহিমার মা ফয়সালকে সেসব কিছুই বলল না। শুধু বলল আপামনি আপনাকে দেখতে চায়। ফয়সাল এক বাক্যে উঠে এসেছে। তাকে দেখে রাত্রি হাসল। মলিন অসুস্থ হাসি। ফয়সাল তার অসুখের জন্য খুব একটা চিন্তিত বোধ করছে না। রাত্রি শক্ত মেয়ে, খুব তাড়াতাড়ি সেরে উঠবে। ফয়সাল হলুক রঙের পাঞ্জাবি পরে আছে। তাকে দেখতে অনেকটা হেডমাস্টারদের মত লাগছে যে কথায় কথায় ধমক দেয়। তবে ফয়সাল তেমন না। সে কাউকেই ধমক দেয়না। তবুও সবাই তাকে সমীহ করে চলে। রাত্রির হঠাৎ মনে হল ফয়সাল আসলে খুব সুন্দর। লম্বা চুল, গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি নিয়ে শিরিঙ্গা শিরিঙ্গা হাত। শুধু হাতের দিকে তাকালে মনে হয় সে পোলিও রোগে আক্রান্ত। না পোলিও না, পোলিও শুধু পায়ে হয় হাতে হলেও হতে পারে রাত্রির জানা নেই। সে কি এখন ফয়সালকে বলতে পারে না, “এই তোমাকে কি আমার শাশুড়ি মা ছোটবেলায় পোলিও টিকা খাওয়ায়নি?” ফয়সালের মাকে রাত্রি পছন্দ করে না। এই মহিলা যেন সবসময় তার সাথে ঝগড়া করতে চায়। রাত্রি বলল, আমার কপালে হাত দিয়ে দেখত আমার জ্বর কেমন? 

ফয়সাল অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার কপালে হাত দিল। 

-আমার জ্বর নেই তাইনা? 

-হ্যাঁ 

-তোমার কথা ঠিক না। আমার জ্বর অনেক বেশি, একশো পাঁচ পয়েন্ট পাঁচ। রাত্রির সামান্য মন খারাপ হল। ফয়সাল তাকে ভাল করে দেখছে না। সে কি রাত্রির সাথে কথা বলার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে? 

- আচ্ছা পুস্পের বড় ভাই যে নিখোঁজ হয়েছিল তাকে কি পাওয়া গেছে? 

-না এখনো পাওয়া যায়নি। কথাটা বলে ফয়সাল চমকে উঠলো। পুস্প নামের একটা মেয়ে অনেকদিন থেকে তার এখানে আশা যাওয়া করে। কিন্তু এটা রাত্রি জানলো কি করে? কেউ কি তাকে বলেছে? এ বাড়ির কেউ তাকে বলবে না। এ বাড়ির সবাই হল তার কেনা গোলাম। এরা তার কথার বাইরে এক পাও কোথাও দিবে না। সে রাত্রির দিকে তাকাল। সে রাত্রির বোঝাকে চেষ্টা করছে। রাত্রির মুখ শান্ত, চেহারায় ক্লান্ত দৃষ্টি। 

-ফয়সাল, তুমি অনেক বুদ্ধিমান। আমি হুট করে কাউকে কিছু না জানিয়ে চলে আসার কারন কি বলতো। 

-হুট করে তোমার মাথায় জরুরি কোন জিনিষ এসেছে।  

- আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে। কষ্টটা শারীরিক না মানসিক বুঝতে পারছি না। তবে তা অনেক গভীর। 

ফয়সাল কিছু বলল না। সে পলক না ফেলে অনেক্ষন রাত্রির দিকে তাকিয়ে রইল।  


মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বৃত্তবন্ধি